
মোঃ অহিদুজ্জামান (রুমু) : গুজব বলতে আমরা কি বুঝি? বাংলাদেশের সবকিছুই কি আসলেই গুজবের হুজুগে হচ্ছে? আমি, আপনি, আমরা কি গুজবাচ্ছন্ন? এটা বুঝতে পারাটাও একটা দক্ষতা।
এই গুজব বুঝতে আমাদের শৈশবের একটা স্মৃতিচারনই যথেষ্ট।
শৈশবে তরমুজ, কালো জাম, কাঁঠাল, খেজুর ইত্যাদি বিচি যুক্ত খেতে গেলে অসাবধানতাবশত বিচি খেয়ে ফেলতাম। সমবয়সী বন্ধু বা খেলার সাথীরা বিষয়টি দেখে ফেললে, সাথে সাথে মন্তব্য করতো – এখন তোর পেটের মধ্যে গাছ জন্মাবে। এই অযাচিত গায়ে পড়ে ভিত্তিহীন মতামত দেওয়াই একটা গুজবের বীজ। প্রতীকী ভাবে এই ঘটনাকে নমুনা হিসাবে ধরে নিলাম।
অসাবধানতাবশত এই বিচি গিলে ফেলার এই অযাচিত মতামত যাচাই করতে বিশ্বস্ত বন্ধু বা অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বড় ভাইদের সাথে শেয়ার করলে তারাও বলতো, হঁ্যা, ঘটনা সত্য – এখন তোর পেটের মধ্যে গাছ জন্মাবে।
শুধু তাই নয়। প্রমান হিসাবে তারা বলতো – অমুক এলাকায় একজন অনেক আগে পেটে গাছ জন্মায়ে মারা গিয়েছিল।
এখানেই ক্ষান্ত নয়। আবার ব্যাখ্যাও দিত। জাম, কাঁঠালের বিচি খেলে পেটের মধ্যে বড় গাছ জন্মাবে, খেজুরের বিচি খেলে কাটাযুক্ত ও তরমুজ খেলে লতাযুক্ত গাছ ইত্যাদি।
যদি জিজ্ঞেস করা হতো “পেটে গাছ জন্মানোর বিষয়টি” কিভাবে জানা গেল। বীরদর্পে উত্তর আসতো – দাদী বা নানীর কাছ থেকে শুনেছে।
সুতরাং বিশ্বাস না করে যাবো কোথায় – এখন আমার পেটে গাছ জন্মাবে!
ব্যাস। Job done. Mission successful. মনের ভিতরে আলবেয়ার কামুর ‘অ্যাবসার্ডিজম’ এর ভিত্তি স্থান পেল। ঐ সময়ে সামান্য কারণে পেটে ব্যথা হলেও চিন্তার শেষ নেই। কারণ বিশ্বাস তো করেই ফেলেছি – পেটের মধ্যে গাছ জন্মাচ্ছে।
মানসচক্ষে দেখতে পেতাম – পেটের মধ্যে বীজের অঙ্কুরোদগম হচ্ছে। দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। হয়তোবা কয়েকদিন পর মুখ অথবা পিছন দিয়ে গাছ বের হবে। একই ভাবে কোন কারণে পেটে ব্যথা হলে অস্তিত্বে অনুভব করতাম – পেটের মধ্যে গাছ বড়ো হচ্ছে। এ যেন অস্তিত্বে ফ্রাঞ্জ কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ এর উপলব্ধি।
যেজন্য এই শৈশব স্মৃতিচারন।ঘটনাটিতে মতামত, তথ্য প্রমাণ, ব্যাখ্যা ও বিশ্বাসযোগ্য সোর্সের সন্নিবেশ – সবই আছে। এমনকি বয়সভিত্তিক জনমতও আছে। তারপরেও বাস্তবতায় বিচি গিলে ফেলায় পেটের মধ্যে গাছ হওয়ার পুরা বিষয়টিই গুজব। এই পরিনত বয়সে এসে জানলাম – এমনকি এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও নাই।
একই ভাবে বর্তমানে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুজবভিত্তিক বিভিন্ন বিশ্বাস এখনো বয়সভিত্তিক বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের চিন্তার জগৎকে নিয়ন্ত্রন করছে। এই বিশ্বাসের মূল ভিত্তি রচনা করতে – সাধারণের মতামত, সিনিয়রদের মতামত, দেখাচোখে বিশ্বাসযোগ্য মানুষের কাছ থেকে প্রমাণ, তথ্য উপাত্ত, ব্যাখ্যা ও গ্রহণযোগ্য ব্যাক্তির রেফারেন্স ব্যবহার করে তথ্য উপাত্তের সোর্স দেখানো হচ্ছে।এবং এর উপর ভিত্তি করে বড় আকারের জনমতও তৈরি হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে দেশের অনেক ইস্যুতে এরকম গুজবের উপর ভিত্তি করেই অনেক ‘জনমত’ আছে। একটা গ্রুপ পরিকল্পিত ভাবে বেশ কিছু গুজব গনবিশ্বাস ও গনমতে পরিণত করাচ্ছে।গুজবভিত্তিক এই জনমত গুলো সরকারের জন্য ভয়ংকর চাপও।
জনমত সমৃদ্ধ এই গুজব গুলোর তোয়াক্কা করলে নিশ্চিত ভাবে দেশ রসাতলে যাবে এবং তোয়াক্কা না করার কারনে দেশ রসাতলে যাচ্ছেও।
দেশের অন্ততপক্ষে নব্বই ভাগ তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ এই গুজবের মধ্যেই আছে, যেটাই আমাদের প্রগতির বাধা ও অন্তরায়।
সংক্ষেপে এই গুজববাজরা দেশের শত্রু, নৈতিকতার শত্রু, ধর্মের শত্রু। এবং এসমস্ত গুজববাজ দলের জনমতের চাপ, সমৃদ্ধির বাংলাদেশ গঠনের পথের প্রধান বিপত্তি ও হুমকি।
সুতরাং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আর্জি থাকবে – এসমস্ত গুজববাজদের জনমত যেন কোন ভাবেই রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম ব্যহত করতে না পারে, দয়াকরে তার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। অন্যথায় গুজবের গজবে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সব কিছুতেই টান পড়বে।