
মোঃ অহিদুজ্জামান (রুমু) : বাংলাদেশের চলমান জাতীয় সংকটের বর্তমান অধ্যয়ে সুশীল, রাজনৈতিক, আমলারা বিতর্কে বুদ হয়ে আছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে না জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগে? আসলেই এটা কি এটা বাংলাদেশের মৌলিক জাতীয় সংকট?
এই নির্বাচন সংকট বার ফিরে আসছে ভিন্ন ভিন্ন রূপে।প্রশ্ন হলো আমাদের মৌলিক জাতীয় সংকট কেন বার বার ফিরে আসছে এবং এর স্থায়ী সমাধান কি?
মূল সমস্যা সনাক্ত হলে সমাধান সহজ।
প্রশ্ন থাকে প্রচলিত সংসদীয় ধারা ও নির্বাচন পদ্ধতিতে-
১. নির্বাচিত হওয়ার পরে জনপ্রতিনিধিরা কি ভোটারের মতামতের তোয়াক্কা করে বা জনগন কি জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারে?
২. জনগনের করভোগী আমলারা কি প্রজাতন্ত্র বা জনগনের কাছে দায়বদ্ধ?
৩. জনপ্রতিনিধি ও আমলাদের মধ্যে কি পারষ্পরিক ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রন আছে?
৪. ক্ষমতাসীন দলের সদস্য, জনপ্রতিনিধি ও আশীর্বাদপুষ্ট আমলারা কি দূনীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে উক্ত রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাকালে শাস্তি পায়?
৫. বিগত প্রতিটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে মধ্যবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে “টাকার বিনিময়ে জীবন ভিক্ষা” নীতিতে বিগত পতিত রাজনৈতিক এলিট ও আমলারা নতুন জীবন পেয়েছে। সেক্ষেত্রেও স্বল্পকালীন মধ্যবর্তী অন্তবর্তী সরকারের ক্ষমতাধর আমলা ও সেনাবাহিনীর পদস্ত কর্মকর্তারা টাকার পাহাড় বিদেশে পাঠিয়েছে ও পরবর্তী গনতান্ত্রিক সরকার আসার পর দেশ ত্যাগ করেছে। এই ধারা এখনও চলমান। এই ধারা প্রতিহতের কোন উদ্যোগ আছে কি?
৬. দেশে বিদেশে গুঞ্জন আছে ফ্যাসিস্টের বিতাড়নের পর দেশব্যপী বিভিন্ন সেনানিবাস থেকে কমপক্ষে ১০০০০ জন পতিত সরকারের দাগী নেতা ও তাদের অতিউৎসাহী আমলা টাকার বিনিময়ে সেফ-এক্সিট পেয়েছে। এই সুযোগ ধরে ফ্যাসিস্ট মুক্ত বাংলাদেশে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরাও রাতারাতি ফুলে ফেঁপে উঠলো। বর্তমান সফল গণঅভ্যুত্থানের পর পরই দাবী উঠেছিল বড় টাকার নোট বাতিল করার। এই দাবী কার্যকরী হয়েছিল কি?
৭. আদর্শ গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবীতে অবাধ, স্বচ্ছ ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচনের স্লোগানে দেশব্যাপী সব রাজনৈতিক দল চাউর এখন। দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে কোন রাজনৈতিক দল স্বচ্ছ ব্যালেটের মাধ্যমে নির্বাচনে করে তাদের কমিটি গঠন করতে পেরেছে কি? উপরন্তু কমিটি বানিজ্যের দৌরাত্বে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা ফুলে ফেপে দৃশ্যত আয়বিহীন সাদাকলারধারী ভদ্রমানুষ। আর নির্বাচন নিয়ে নমিনেশন বানিজ্যতো আছেই। রাজনৈতিক দলগুলোর এই অপচর্চা নিয়ন্ত্রনে নির্বাচন কমিশনের কোন নিয়ন্ত্রন আছে কি?
৮. দায়িত্ব গ্রহনের আগে আমলাসহ সাংবিধানিক পদধারী ব্যক্তির্গের সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের দাবী সব সময়ই ছিল – সময়ের দাবী। এমনকি এই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন
সরকারের আমলা, উপদেষ্টারা তাদের সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে?
৯.বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের স্বপ্নদোষ, বিদেশী এজেন্টদের অভিপ্রায় বাস্তবায়নের কর্মসূচী, বিভিন্ন ধর্ম ও মতাবলম্বীর স্বল্প ধর্মীয় জ্ঞান সম্পন্ন মানুষের ধর্মীয় আবেগকে পুজি করে যে যার মত অপব্যাখ্যায় জনগনকে পথভ্রষ্ট করা ও রাষ্ট্র ব্যবস্হাকে অস্থির করা – সব সময়ই আমাদের গনতান্ত্রিক ধারার অন্যতম অন্তরায়। প্রতিবারই সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথেই আমাদের উন্নয়ন ও অর্থনীতি “বানরের তৈলাক্ত বাঁশে উঠা” নীতির মতই চলছে। জাতীয় স্বার্থে “আমাদের উন্নয়ন ও অর্থনীতি সব কিছুর উর্ধে” – এলক্ষ্যে কখনও জাতীয় ঐক্যমত এসেছে কি?
১০. প্রশাসন, বিচার বিভাগসহ আমলারা সব রাজনৈতিক সরকারের আমলেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিপরীত ক্রমে অতিউৎসাহী প্রশাসনের অনেকে ও কতিপয় আমলা অতিরাজনৈতিক হয়ে অনৈতিক সিন্ডিকিটে জড়িত। এমনকি বর্তমান অন্তর্বর্তী কালীন সরকারের আমলেও তা দৃশ্যমান। সুস্থ গনতান্ত্রিক ধারা গড়তে কোন রাজনৈতিক দল কি এই ধারা ও অপচর্চার সমাপ্তি চেয়েছে ও পদক্ষেপ নিয়েছে।
১১. সাংবিধানিক পদ বা রাজনৈতিক সুবিধাজনক পদে থেকে আত্মীয়-স্বজন বা স্বপ্রতিষ্ঠানের জন্য রাষ্ট্রীয় সুবিধা নেওয়া – দেশ স্বাধীনের পর থেকেই চলমান। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অনেকেই এই দোষে দুষ্ট। এগুলো সনাক্ত ও বন্ধের জন্য কখনও কি কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
১২. আর স্বাধীন দেশে রাজনৈতিক পালাবদলের প্রতিক্রিয়ায় মৃত্যুর মিছিলের কথা না’ই বা বললাম।
আমাদের এই জাতীয় সমস্যাগুলোর খন্ড চিত্রের একাংশের ফিরিস্তি দেওয়ার কারন একটাই – আমাদের মৌলিক জাতীয় সমস্যা গুলো কি কি।আর বাস্তবতায় আমাদের রাজনৈতিক, আমলা, সুশীলরা আমাদেরকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
সহজ কথায় – “জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগে, না স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে” – এই ইস্যুতে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টিকরা জনগনকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করার পায়তারা মাত্র।এটা রাজনৈতিক এলিটশ্রেনী ও আমলাদের তবিয়ত বহাল রাখার সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত।
সব কিছুর সমাধান একটাই – ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রনের ভিত্তিতে দুই স্তর বিশিষ্ট জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করা। এই দুই স্তর বিশিষ্ট জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার ধারনার সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নীচে আছে।
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ এ রচিত বর্তমান এই সংবিধানবিধিবদ্ধ পদ্ধতিতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন এবং জনপ্রতিনিধি ও আমলাদের কার্যভূমিকায় জনগনের আশা ও আকাঙ্খার প্রতিফলন যে একেবারেই হয় নাই – এটাও বলা যাবে না। মূলত কতিপয় রাজনৈতিক, সুশীল ও আমলাদের অসাধু ও কায়েমী স্বার্থে এই সরকার ব্যবস্থা একটা শ্রেনী গোষ্ঠীর এলিটতন্ত্র বাস্তবায়নের রূপরেখায় পরিনত হয়েছে। বর্তমানসহ বিগত দিনগুলোর সব রাজনৈতিক সংকটগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে – রাজনৈতিক দল, নেতা ও আমলাদের অসাধু ও কায়েমী স্বার্থেই পরিবর্তিত নতুন রাজনৈতিক প্লেগ্রাউন্ড একাধিকবার এসেছিল। তাহলে এই জাতীয় সংকটগুলোর স্থায়ী সমাধান আদৌও আছে কি?
মূল সমস্যা হলো রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার যে সমস্ত রাজনৈতিক, আমলা, সুশীলরা এগিয়ে আসে, তাদের অধিকাংশের মধ্যে নৈতিকতা ও দেশ প্রেমের অভাব। সাংবিধানিক আইনের সুযোগ নিয়ে অনৈতিক সুবিধার সুযোগ অধিকাংশই নিয়েছে এবং নিচ্ছে। সুতরাং এলিট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এরই ফলশ্রুতিতে জাতীয় ঐক্য সংকটে।
এমতাবস্থায় কতিপয় শ্রেনী গোষ্ঠীর এলিটতন্ত্রের উপর জনগনের নিয়ন্ত্রন আনতে সংবিধান পরিমার্জন এবং সরকার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার বিকল্প নাই। জনগনের রাষ্ট্র ভাবনার পূর্নাঙ্গ আশা ও আকাঙ্খার প্রতিফলন বলতে এই নিয়ন্ত্রনের সঠিক প্রয়োগই হবে সম্ভাব্য সঠিক পদ্ধতি। এবং রাজনৈতিক জাতীয় সংকটের স্থায়ী সমাধান, আগামীর স্থিতিশীল বাংলাদেশ ও রাষ্ট্র সংস্কারের এটাই প্রথম ধাপ হওয়া উচিৎ।
সংবিধানে বা রাষ্ট্রের কার্যক্রমে আম-জনতার আশা ও আকাঙ্খার প্রতিফলন বলতে জনগন বুঝাতে চায়?
সারকথা, দুই স্তর বিশিষ্ট জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা এমন হতে হবে – যেখানে এমপি বা আইন পরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হবে জেলা ভিত্তিক স্থানীয় মিনি পার্লামেন্টের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ভোটে। আর এই স্থানীয় মিনি পার্লামেন্টের জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হবে প্রতিটা জেলার জনসংখ্যা,ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ভৌগলিক অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক অঞ্চল ভেদে গঠিত স্থানীয় ও ক্ষুদ্র জনপদের জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে।
মিছিল, মিটিং, আলোচনা সভা, হাট বাজারের চায়ের দোকানে, গ্রামের গাছতলার মিনি পার্লামেন্টে রাষ্ট্র ব্যবস্হাপনায় বঞ্চিত কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, জনতার হতাশার আলোচনায়, পাহাড়, সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যে রাষ্ট্র চিন্তার ভাবনা – তার প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগ থাকবে এই স্ব স্ব ও স্থানীয় মিনি পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর সংবিধান পরিমার্জন ও জনপ্রতিনিধি নির্বাচন পদ্ধতিতে পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
বাস্তবমুখী পদক্ষেপ হিসাবে সংবিধান পরিমার্জন, জেলা ভিত্তিক স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইন প্রনেতা / এমপি ও প্রজাতন্ত্রের আমলাদের জনগনের কাছে জবাবদিহিতা ও তাদের পারস্পরিক ভারসাম্যের রূপরেখা কেমন হতে পারে?
প্রথম ধাপ হবে – সহজ, সরল ধারায় ও সাধারন মানুষের বোধগম্য ভাষায় সংবিধান পরিমার্জনের মাধ্যমে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইন সভার সদস্য / এমপি ও আমলাদের স্বচ্ছ জবাবদিহিতার আওতায় আনার পরিকল্পনার রূপরেখা।
জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরনে সরকার ব্যবস্হা হতে হবে দুই স্তর বিশিষ্ট জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা। কোনভাবেই দ্বিকক্ষ বা এককক্ষ বা সংখ্যানুপাতিক নয়।
কেন্দ্রীয় সংসদ / আইন সভার সদস্য / এমপির সংখ্যা ২০০ হলে যৌক্তিক হবে। যেহেতু প্রতিটা জেলায় জনসংখ্যা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ভৌগলিক অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক অঞ্চল ভেদে প্রত্যক্ষভাবে জনগন দ্বারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকবে সেহেতু কেন্দ্রীয় সংসদে সংরক্ষিত আসন নূন্যতম বা না থাকলেও যৌক্তিক হবে।
কেন্দ্রীয় জাতীয় সংসদের এই ২০০ আসনকে দেশব্যাপী জনসংখ্যা, নৃগোষ্ঠী, ভৌগলিক অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক অঞ্চল ভেদে ২০০ সংসদীয় নির্বাচনী সীমারেখায় সুষম পুনর্বিন্যাস করতে হবে। হিসাবমতে গড়ে প্রতিটি জেলায় ৩টি কেন্দ্রীয় সংসদীয় আসন আসবে।
এই প্রতিটি কেন্দ্রীয় / জাতীয় সংসদের নির্বাচনী আসন একই ভাবে জনসংখ্যা, নৃগোষ্ঠী, ভৌগলিক অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক অঞ্চল বিবেচনায় ২৫ / ৩০ টি নির্বাচনী সীমারেখায় বিভক্ত করতে হবে। জনসংখ্যা, নৃগোষ্ঠী, ভৌগলিক অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক অঞ্চল ভেদে এই ২৫ / ৩০ অঞ্চলই হবে কেন্দ্রীয় আইন সভা / সংসদের সংশ্লিষ্ট প্রতিটি আসনের এমপি /সংসদ সদস্যদের আসন।
আন্চলিক মিনি পার্লামেন্টের এই নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কতৃক সুপারিশ প্রাপ্ত স্থানীয় প্রতিনিধি বা স্বতন্ত্র প্রাথীরা প্রতিদ্বন্দীতা করবে।
২০০ আসন বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় জাতীয় সংসদের প্রতিটি আসনের এমপি বা আইন প্রনেতাদের প্রাথীতা ঘোষিত হবে রাজনৈতিক দল কতৃক বা স্বতন্ত্র স্ব ঘোষিত প্রাথী।এই এমপি প্রার্থীরা তাদের স্ব স্ব নির্বাচনী এলাকার আণ্চলিক প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্টের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এমপি বা কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্য হবে।
আন্চলিক মিনি পার্লামেন্টের সদস্যদের নুন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হবে গ্রাজুয়েশন / স্নাতক। এই মিনি পার্লামেন্টের সদস্যরা অভিশংসনের মাধ্যমে তাদের নিজ নির্বাচনী এলাকার আইন পরিষদের সদস্য বা এমপিকে পদত্যাগ করাতে পারবে।
(কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্য বা এমপির মধ্যে রাষ্ট্রের চেতনা বিরোধী কার্যক্রম পরিলক্ষিত হলে)।
দেশব্যাপী আণ্চলিক প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল গুলোর কাছে নূন্যতম সদ্য স্নাতক সম্পন্নকৃত তরুন / তরুনী প্রাথী করার সুপারিশ থাকবে।
আন্চলিক মিনি পার্লামেন্ট কিভাবে কাজ করবে?
প্রতিটি জেলা ভিত্তিক আন্চলিক মিনি পার্লামেন্টের কার্যক্রম পরিচালিত হবে প্রতিটি জেলা সদর থেকে।
জাতীয় সংসদ / কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে ২০০ আসন হলে গড়ে
প্রতিটি জেলায় ৩টি টি সংসদীয় আসন আসবে। সুতরাং প্রতিটি আণ্চলিক মিনি পার্লামেন্টের প্রতিনিধি সংখ্যা হবে ৭৫ / ৯০ টি।
প্রতিটি আন্চলিক মিনি পার্লামেন্টেও একজন প্রধানমন্ত্রী থাকবে। এই আন্চলিক মিনি পার্লামেন্টের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবে আন্চলিক মিনি পার্লামেন্টের ৭৫/৯০টি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে। এই হিসাবে দেশব্যাপী ৬৪ টি আণ্চলিক মিনি পার্লামেন্ট ও আন্চলিক প্রধানমন্ত্রী থাকবে।
সহজ কথায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একটা বৃহৎ দলের হলেও জেলা বা আন্চলিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী ভিন্ন ভিন্ন ছোট দল বা মতবাদের নেতাদেরও হওয়ার সুযোগ থাকবে। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশের বেশ কিছু অন্চলে নির্দিষ্ট কিছু মতবাদের দলের ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও প্রচলিত পদ্ধতিতে তারা দেশ গঠনে অংশগ্রহনের সুযোগ পায় না। সেক্ষেত্রে তারা রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ পাবে।
আন্চলিক মিনি পার্লামেন্টের প্রধান মন্ত্রীর দপ্তর হবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সাথে। এই আণ্চলিক প্রধান মন্ত্রীর শিক্ষাগত যোগ্যতা অবশ্যই স্নাকোত্তর হতে হবে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এমপি / আইন প্রনেতা ও আমলাদের ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারন কেমন হওয়া উচিত?
জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের পারষ্পরিক দায়বদ্ধতা এমনভাবে সাজাতে হবে যেখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এমপি ও আমলাদের প্রত্যেকের একে অন্যের উপর নিয়ন্ত্রন থাকবে।
১. প্রতিটি মিনি পার্লামেন্টের জন্য একটা আন্চলিক সংসদীয় কমিশনার প্যানেল গঠন করতে হবে। সংসদীয় এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসকারী অরাজনৈতিক অবসরপ্রাপ্ত পদস্থ
সামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষক, আমলা, অকুতোভয় সাংবাদিক, জেলায় চাকুরিরত দূদক কর্মকর্তা, জেলা ও দায়রা জজ এই সংসদীয় কমিশনার প্যানেলের সদস্য হবে।
একই ভাবে কেন্দ্রীয় জাতীয় সংসদের জন্য একই আদলে উঁচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন সুপ্রীম সংসদীয় কমিশনার প্যানেল গঠন করতে হবে।
২. স্হানীয় মিনি পার্লামেন্টের জনপ্রতিনিধিরা অভিসংসনের মাধ্যমে তাদের নিজ এলাকার এমপি / আইন পরিষদের সদস্যকে ক্ষমতাচ্যুত করাতে পারবে। (রাষ্ট্রের চেতনা বিরোধী কোন কার্যক্রম পরিলক্ষিত হলে।)
৩. স্থানীয় মিনি পার্লামেন্টের সদস্য কার্যবিধি অনুসরন না করলে জেলা প্রশাসক তাদের বরখাস্ত করার ক্ষমতা প্রাপ্ত হবে। পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদীয় কমিশনার প্যানেল এ বিষয়ে চুডান্ত সিদ্ধান্ত নিবে।
৪. দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য – কোন ভাবেই যে কোন স্তরের জনপ্রতিনিধির দূর্নীতি বা কর্তব্য অবহেলা প্রমানিত হলে ঐ স্তরের পার্লামেন্টের ঐ প্রার্থীর আসনে পুনঃনির্বাচন হবে।
৫. জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহনকারী রাজনৈতিক দল গুলোর নিবন্ধনের পূর্ব শর্ত থাকতে হবে তাদের প্রতিটি কমিটির সুপার-৯ সদস্য স্বচ্ছ ব্যালট ভোটে নির্বাচিত হবে। রাজনৈতিক দল গুলোর মধ্যে এই নিয়ম চালু করলে ভবিষ্যতে কখনও রাজনৈতিক দানব তৈরী হবে না।
৬. জনপ্রতিনিধি , আমলা ও তাদের স্ত্রী পরিজনের সম্পদের হিসাব প্রতিবছর জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।
৭. স্ব স্ব বিভাগীয় বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনসহ সংশিষ্ট আমলা ও জনপ্রতিনিধি একে অন্যের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন লিখবে। যাতে পরবর্তীতে কোন দূর্নীতি বা কর্তব্য অবহেলার অভিযোগে কেউ ছাড় না পায় ও দূর্নীতি চক্রের অন্যরা অজুহাত দিতে না পারে।
৮. কোন জাতীয় ইস্যুতে মতানৈক্য থাকলে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত লিখিত আকারে জনসন্মুখে প্রকাশ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
এক কথায়, সব সময়ই জাতীয় স্বার্থের তোয়াক্কা না করে, “আমার নীতি গ্রহন হলে সব ঠিক, না হলে সব বেঠিক” এই নীতিতেই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো অটল।ফলশ্রুতিতে সব রাজনৈতিক দলগুলো মুখোমুখি এবং গৃহযুদ্ধ অনিবার্য। সাম্প্রতিক কুয়েট সংঘর্ষ তার উদাহরন।
এভাবে চলতে থাকলে এই মতানৈক্যের মধ্যেই হয়তবা পতিত শক্তির পুনর্জন্ম হবে অথবা এই বর্তমান রাজনৈতিক আবহাওয়াই আরেক ফ্যাসিস্টের জন্ম দিবে। প্রজাতন্ত্রের
মালিক জনগনের রক্ত স্বাধীন দেশে ঝরতেই থাকবে।আর সোনার বাংলা থেকেই যাবে মধ্যস্বত্বভোগী এলিটদের লালসার স্বর্গরাজ্য হয়ে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশের সামনে দুইটি পথ খোলা – জাতির স্থায়ী গনতান্ত্রিক মুক্তি অথবা গৃহযুদ্ধ। সুতরাং সামগ্রিক ভাবে সব কিছুতে লাগাম আনতে নিয়ন্ত্রন ও ভারসাম্যের দুই স্তর বিশিষ্ট সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার বিকল্প নাই। “স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে, না জাতীয় নির্বাচন আগে” বিতর্কসহ গনতান্ত্রিক পথে হাঁটার জাতীয় সংকটগুলোর উৎকৃষ্ট সমাধানই হলো এই দুই স্তর বিশিষ্ট জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা।