
মোঃ অহিদুজ্জামান (রুমু) : আজ পড়ন্ত বিকাল থেকেই যুক্তরাজ্য সরকার জনসাধারণের উদ্দেশ্যে তাদের মুঠোফোনে এলার্মসহ দেশব্যাপী ভয়াবহ দাবানলের একটি জরুরি সতর্কতা ততোধিকবার (“Severe Alert”) পাঠিয়েছে।
মোটাদাগে সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, তীব্র তাপদাহ ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে দেশজুড়ে ভয়াবহ দাবানলের (Wildfires) মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সুতরাং আগুন লাগাতে পারে এমন কোনো কর্মকাণ্ড—যেমন বার্বিকিউ, ফায়ারপিট বা আতশবাজি ফুটানো থেকে বিরত থাকতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি সর্বশেষ এই লেখা চলাকালীন সময়েও আমার মুঠোফোনে সতর্কবার্তা পেয়েছি।

দেশপ্রেম থাকলে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশের জনগণের, যুক্তরাজ্যের এই পরিস্থিতি থেকে, বাংলাদেশের বাস্তবতা অনুধাবনের অনেক কিছুই আছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ উন্নত দেশ যুক্তরাজ্য যেখানে প্রকৃতির চরম রূপ, তাপদাহ, অগ্নিকাণ্ড ও তীব্র পানি সংকটের মতো মৌলিক দুর্যোগ সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে আমাদের বাংলাদেশের সার্বিক বিষয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব অনুধাবন করা জরুরি।
চলমান বৈশ্বিক সংকটে বিশ্বজুড়ে যে থমথমে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়েছে, তার যাঁতাকলে বাস্তবতার শিকার বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো। যখন ইউকে-র মতো প্রথম বিশ্বের সমৃদ্ধ দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট কিংবা কোনো পরাশক্তির লড়াইয়ের প্রভাব বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর ঠিক কতটা প্রকট হতে পারে—তা সহজেই অনুধাবন করতে পারাটাই হলো বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা। তার উপর বাংলাদেশ সদ্য সর্বস্ব হরিলুটে ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশ, সুযোগ পেয়ে কোনো দল বা গোষ্ঠীই ছাড় দেয় নাই ।
আন্তর্জাতিক সংবাদ পর্যালোচনায় ও বিশেষজ্ঞদের মতে – বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও সরবরাহের শেকল (Supply Chain) ভেঙে পড়লে, তার প্রথম শিকার হয় উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলো।
যেজন্য এই জানান দেওয়া । বাংলাদেশে এখন বিদ্্যুৎ, গ্যাসসহ অন্যান্য জ্বালানি সংকট নিয়ে জনমনে ও রাজনীতিতে দারুণ অস্থিরতা। সংক্ষেপে বাংলাদেশের এই বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং জ্বালানি সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন বা স্থানীয় কোনো কাঠামোগত বিষয় নয়, বরং বিশ্বব্যাপী চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ভুরাজনীতিরই পরোক্ষ প্রতিফলন। প্রথম বিশ্বের শক্তিশালী অর্থনীতিগুলো যেখানে চলমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ ও নাগরিক সেবা ঠিক রাখতে নাভিশ্বাস তুলছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের ও লাগামহীন দুর্নীতি পরবর্তী অবস্থায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত পুরোপুরি সচল রাখা প্রায় অসম্ভব ও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
যাহোক পুরা যুক্তরাজ্যে ব্যাপী আগুনলাগার খন্ডচিত্র বিগত কয়েক দিন ধরে বেড়েই চলেছে ।আজও বার্মিংহামে বড় পরিসরে আগুন লাগার খবর আসলো। এই নিয়ে নেই কোনো দোষারোপের রাজনীতি।এই দাবানলের শঙ্কা নিয়ে গতপরশু বুধবার COBRA মিটিংএ প্রধানমন্ত্রী এন্ডি বার্নহাম জরুরি সিদ্ধান্ত নেন এবং আজ শুক্রবার জনসাধারণকে অবগত করার জন্য দেশজুড়ে সবার মুঠোফোনে ততোধিকবার এলার্মসহ জরুরি সতর্কবার্তা আসে। এই একটি ছোট সতর্কবার্তা যুক্তরাজ্যের পুরো সমাজকে সচেতন করে তুলেছে।সতর্কতাবার্তা পাঠানো পর আমি ব্যাক্তিগতভাবে পূর্ব লন্ডনের কিছু ব্যস্ততম এলাকার চালচিত্র বলতে পারি। কারণ মাগরিবের সময় মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফেরাত কামনায় মিলাদ মাহফিলে শরীক হতে ব্যস্ততম পূর্বলন্ডন এলাকার ব্রিকলেন মসজিদ ও পরবর্তীতে এক শুভানুধ্যায়ী সাংবাদিক বন্ধুর সাথে হোয়াইটচ্যাপল সহ প্লাস্টো, স্ট্র্যাটফোর্ড ও দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের গ্রিনিচ এলাকা আমি একা পর্যবেক্ষণ করলাম। সতর্কবার্তার পরে লন্ডনবাসী, এমনকি বাইরে ধূমপানও, খুব সতর্কতার সাথে করছে। আর যারা শখের বাগান করে, তারা তো না পারতে যৎসামান্য পটে করে গাছে পানি দেয়, হোস পাইপে পানি দেওয়াতো সবাই এখন দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ বলে মনে করে ।
যুক্তরাজ্যের এই সামগ্রিক সচেতনতা থেকে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের সম্ভাব্য কি কি অনুকরণীয় হতে পারে? বৈশ্বিক এই সংকটকালে বিদু্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির অপচয় রোধ ও সংযমই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিকার। প্রথমত প্রতিটি নাগরিকের উচিৎ অহেতুক বিদ্যুৎ ও গ্যাস অপচয় বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত সরকারের উচিৎ আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈশ্বিক সঙ্কটের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশীয় বিকল্প শক্তির ওপর নজর বাড়ানো।
সংকট কেবল একটি দেশের নয়, বিশ্ব আজ একসূত্রে বাঁধা। উন্নত বিশ্বের আজকের এই ভীতিকর পরিস্থিতি কিংবা অসহায় পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আপদকালীন সময়ে সচেতনতা ও সম্পদের সঠিক ব্যবহার ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।