আইনজীবী হওয়ার বয়সসীমা ৩৫: সংবিধান, কমনওয়েলথ রীতিনীতি ও আইনপ্রণেতাদের যোগ্যতার সাথে সাংঘর্ষিক উদ্যোগ

কাল্পনিক চিত্র


মো: অহিদুজ্জামান (রুমু) : ৩৫ বছর বয়সের পর আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার পথ বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে আজ জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘এজিএ–ইউএনডিপি ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম’-এর সমাপনী ও নবীন ইন্টার্ন বরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান। 

আইনি পেশায় মান রক্ষা ও শৃঙ্খলা আনয়নের লক্ষ্যে নেওয়া সরকারের এ উদ্যোগকে বর্তমানে আইনি অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হচ্ছে । তবে স্বাধীন পেশা হিসেবে স্বীকৃত ওকালতিতে বয়সের এই দেওয়াল তোলা কতটা যুক্তিযুক্ত—তা নিয়ে সংবিধান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বৈপরীত্যের ভিত্তিতে নানা প্রশ্ন উঠছে এবং তা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে দেশে ও বিদেশে শিক্ষানবিশদের মধ্যে। 

এটা আমাদের স্বাধীন পেশা বেছে নেওয়ার পথে অযাচিত বাধা নয় কি?গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩য় ভাগে বর্ণিত ৪০ অনুচ্ছেদ নাগরিককে পেশা বা বৃত্তির মৌলিক স্বাধীনতার গ্যারান্টি দেয়। সেখানে বলা হয়েছে, আইন নির্ধারিত যোগ্যতা সাপেক্ষে যেকোনো নাগরিক তার পছন্দসই আইনসঙ্গত পেশা বেছে নিতে পারবেন।

সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, বার কাউন্সিল আইন অনুশীলনের জন্য মেধা, পরীক্ষা ও যোগ্যতার শর্ত আরোপ করতে পারে। কিন্তু ‘বয়স’ কখনোই মেধা বা যোগ্যতার সমার্থক হতে পারে না। সরকারি বা কর্পোরেট চাকরির ক্ষেত্রে অবসরের নির্দিষ্ট বয়সসীমা থাকলেও আইন কোনো বাধা-ধরা চাকরি নয়; এটি একটি স্বাধীন পেশা (Free/Self-Employed Profession)। ফলে উপযুক্ত একাডেমিক ও পেশাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেবল বয়সের অজুহাতে কাউকে এই পেশায় প্রবেশে বাধা দেওয়া সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হতে পারে।

হাস্যকর বিষয় হলো আইনজীবীর বয়স ও যোগ্যতা বেড়াজাল থাকলেও আইন প্রনেতার কোনো বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না। আইন পেশায় প্রবেশের বয়সসীমা আরোপের বিরুদ্ধে অন্যতম শক্ত দুমুখো যুক্তি হিসেবে উঠে এসেছে বর্তমান জাতীয় সংসদের উদাহরণ। বাংলাদেশের আইনপ্রণেতা বা MP রাষ্ট্র পরিচালনাসহ সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনা করেন। সংবিধানে তাদের জন্য কোনো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোনো ঊর্ধ্ব বয়সসীমাও নির্ধারণ করা নেই।

বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—যে দেশে রাষ্ট্র পরিচালনার আইন পাসের জন্য কোনো ডিগ্রি বা সর্বোচ্চ বয়সসীমা লাগে না, সে দেশে তৈরি করা সেই আইন আদালতে পাঠ ও প্রয়োগ করার জন্য ৩৫ বছরের বয়সের কৃত্রিম প্রাচীর তোলা কতটা সঙ্গত?

আইন তৈরি ও পাসের মতো জাতীয় নীতি-নির্ধারণী কাজে বয়স ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বাধা না হলে, বিচারালয়ে সেই আইন চর্চা ও স্বাধীন পেশা হিসেবে ওকালতি করার ক্ষেত্রে বয়সের কড়াকড়ি আরোপ করা একটি স্পষ্ট দ্বিমুখী নীতি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর রীতিনীতি ও বৈশ্বিক নজিরের আলোকে পর্যালোচনায় – বাংলাদেশ যে Common Law আইনি ব্যবস্থা অনুসরণ করে, তার মূল উৎস কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর রীতিনীতি। লক্ষণীয় বিষয় হলো, যুক্তরাজ্যসহ কোনো প্রধান কমনওয়েলথ দেশেই আইন পেশায় যোগদানের কোনো ঊর্ধ্ব বয়সসীমা নেই। যেমন –

 যুক্তরাজ্য (UK): ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ব্যারিস্টার বা সলিসিটর এনরোলমেন্টের জন্য ন্যূনতম বয়সের বাধ্যবাধকতা থাকলেও কোনো সর্বোচ্চ বয়স সীমা রাখা হয়নি। অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও সফলভাবে আইনজীবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে থাকেন। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড: পেশাগত দক্ষতা ও নৈতিক চরিত্রই সেখানে একমাত্র মাপকাঠি।

 ভারত: ভারতের বার কাউন্সিল অতীতে আইনজীবী এনরোলমেন্টের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪৫ বছরের বয়সসীমা বেঁধে দেওয়ার একটি নিয়ম জারি করেছিল। তবে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট Indian Council of Legal Aid and Advice vs. Bar Council of India মামলায় উক্ত নিয়মটিকে সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করার কারণে অকার্যকর ও অবৈধ ঘোষণা করে।

বাস্তবতায় বার কাউন্সিলের প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও পরীক্ষার্থীদের নানা শঙ্কাজনিত আন্দোলনে বাংলাদেশে নিয়মিত বিরতিতে বার কাউন্সিল এনরোলমেন্ট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হওয়ার ফলে দীর্ঘ সেশন জট তৈরি হয়। অনেক শিক্ষার্থী ২৫ বছর বয়সে এলএল.বি শেষ করলেও তালিকাভুক্ত হতে হতে ৩০ থেকে ৩২ বছর পার হয়ে যায়। এমন বাস্তবতায় ৩৫ বছরের ঊর্ধ্ব সীমা কার্যকর হলে বার কাউন্সিলের নিজস্ব প্রশাসনিক বিলম্বের খেসারত অন্যান্য বা সব পরীক্ষার্থীদেরই দিতে হয়।

আইন পেশায় পেশাদারিত্ব বজায় রাখা ও শৃঙ্খলা আনয়ন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে বয়স বেঁধে দেওয়ার চেয়ে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমেই এই মান নিশ্চিত করা বেশি যৌক্তিক:

১. স্বচ্ছ ও নিয়মিত পরীক্ষা: প্রতি বছর সুনির্দিষ্ট সময়ে আন্তর্জাতিক মানের মেধা যাচাই পরীক্ষার আয়োজন করা।

২. কঠোর ট্রেনিং ও ইন্টার্নশিপ: সনদের আগে প্রার্থীদের আইনি অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং জোরদার করা।

৩. মেধাভিত্তিক ফিল্টারিং: বয়স না দেখে কঠোর পরীক্ষা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে অযোগ্যদের ছাঁটাই করা।  

সংবিধানের মূল চেতনা, বিশ্বব্যাপী প্রচলিত কমনওয়েলথ রীতিনীতি এবং সংসদীয় ব্যবস্থার মূল গণতান্ত্রিক নীতিকে বিবেচনায় না নিয়ে আইন পেশায় প্রবেশের ওপর কঠোর বয়সের বিধিনিষেধ আরোপ করা টেকসই সমাধান নয়; বরং যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়নই আইনি অঙ্গনকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Grandpashabet giriş | Grandpashabet | Grandpashabet | Grandpashabet | Grandpashabet | Grandpashabet | Grandpashabet | Grandpashabet | Grandpashabet | Grandpashabet | Grandpashabet | Grandpashabet | Deneme Bonusu Veren Siteler | Deneme Bonusu | Deneme Bonusu Veren Siteler | Bedava Bonus Veren Siteler | Deneme Bonusu | Deneme Bonusu Veren Siteler | Deneme Bonusu Veren Siteler | Deneme Bonusu Veren Siteler 2026 | Deneme Bonusu Veren Siteler | Deneme Bonusu Veren Siteler | Deneme Bonusu 2026 | Deneme Bonusu Veren Yeni Siteler | Bonus Veren Siteler | Deneme Bonusu Veren Yeni Siteler | Deneme Bonusu Veren Siteler 2026 | Deneme Bonusu Veren Güvenilir Siteler | Deneme Bonusu Veren Siteler | Deneme Bonusu Veren Siteler | Bedava Deneme Bonusu | Deneme Bonusu Veren Siteler | Yatırımsız Deneme Bonusu | Deneme Bonusu Veren Siteler | Deneme Bonusu | Deneme Bonusu Veren Siteler | Deneme Bonusu