
মোঃ অহিদুজ্জামান (রুমু): দেশে ইদানিং উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বিভিন্ন জাতের ওয়ারিশ, বেওয়ারিশ কুকুর ও বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। একই সাথে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে জলাতঙ্কবিরোধী ভ্যাকসিনের (অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন) তীব্র সংকট তৈরি হওয়ায় দেখা দিয়েছে চরম আতঙ্ক ও মানবিক বিপর্যয়।
এই জলাতঙ্ক এমন এক নির্মম বাস্তবতার নাম, যেখানে রোগীর লক্ষণ একবার প্রকাশ পেলে তা শতভাগ নিরাময় অযোগ্য, অথচ সঠিক সময়ে সামান্য সচেতনতায় শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য।
সাম্প্রতিককালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জলাতঙ্কগ্রস্ত এক অবোধ শিশুর কৃচ্ছ্রসাধন ও বিড়ালের মতো চিৎকার করার মর্মান্তিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এই রোগ ও প্রতিষেধক সংকট নিয়ে সারাদেশে গভীর আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিগত চার বছরে দেশে প্রাণীর কামড় খেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৯৪,৩৮০ জন, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১,২২,২৬৩ জনে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ১,৪৬,০০০ অতিক্রম করে। আর চলতি ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসেই (সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) রেকর্ড ১,০৭,৫৫৮ জনেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা চেয়েছে।
টিকার অপ্রতুলতা এবং সচেতনতার অভাবে দেশব্যাপী বাড়ছে জলাতঙ্কে মৃত্যুর ঘটনা। সরকারি তথ্য মতে, ২০২৩ সালে জলাতঙ্কে ৪২ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসেই সরকারি হাসপাতালে ১৯ জনের করুণ মৃত্যু রেকর্ড করা হয়।
তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি রেকর্ডের চেয়ে বহু গুণ বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর রেবিস কন্ট্রোল (জিএআরসি)-এর মহামারী সংক্রান্ত সমীক্ষা অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতার অভাব এবং ঝাড়ফুঁক বা কবিরাজি চিকিৎসার চক্করে পড়ে হাসপাতালে না পৌঁছেই দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৯৩৩ জন মানুষ জলাতঙ্কে প্রাণ হারায়।
আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য নীতি অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে জলাতঙ্কের সংক্রমণ শৃঙ্খল ভেঙে দিতে অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরকে গণ-টিকাদানের (মাস ডগ ভ্যাকসিনেশন) আওতায় আনা জরুরি। তবে জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে আনুমানিক ১৬ লাখ ৬৮ হাজার বেওয়ারিশ কুকুরের বিপরীতে মাত্র ৫.০৯ শতাংশ কুকুরকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।
২০২৫ সাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালনা সংক্রান্ত পুনর্গঠন ও অর্থায়নের জটিলতায় গণ-কুকুর টিকাদান প্রকল্পগুলো প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে পথকুকুরের মাধ্যমে ভাইরাসের বিস্তার কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না।
হাসপাতালগুলোতে ভ্যাকসিনের হাহাকার মেটাতে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্কে “শূন্য মৃত্যু”র বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে সরকার নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। সংকট সামাল দিতে দেশের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস) থেকে ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তরের (ডিজিডিএ) কাছে ২০ লক্ষ ডোজ অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন জরুরি ভিত্তিতে আমদানির প্রশাসনিক প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল প্রতিষেধক আমদানি করে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। তাদের মতে, সংকট নিরসনে ‘ওয়ান হেলথ’ কাঠামোর অধীনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার বিভাগকে একযোগে কাজ করতে হবে। একই সাথে তৃণমূল পর্যায়ে এই বার্তা পৌঁছে দিতে হবে যে, কামড় বা আঁচড় লাগার সাথে সাথে ক্ষতস্থানটি প্রবাহমান পানি ও সাবান দিয়ে টানা ১৫ মিনিট ধুলে ভাইরাসের বড় অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় এবং এরপর দ্রুত সরকারি হাসপাতালে গিয়ে টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক।